Theme images by Storman. Powered by Blogger.

Recent in Sports

Comments

Random Posts

Featured Posts

Tuesday, July 4, 2017

ইঙ্গ লেম্যানঃ পৃথিবীর কেন্দ্র আবিষ্কার করেছিলেন যিনি

- No comments
বলুন তো কীভাবে আমরা পৃথিবীর কেন্দ্র সম্পর্কে জানব? সেখানে রয়েছে অত্যুচ্চ তাপমাত্রা, অত্যন্ত বেশী চাপ এবং প্রচলিত যন্ত্রপাতির পক্ষেও ঐ দূরত্বে যাওয়া সম্ভব না।
উত্তরঃ এজন্য বিজ্ঞানীরা seismic wave বা ভূকম্পন তরঙ্গের উপর নির্ভর করেন। এই তরঙ্গগুলো ভূমিকম্প, বিস্ফোরণ ইত্যাদির ফলে উৎপন্ন হয় এবং পৃথিবীর অভ্যন্তর ও উপরিভাগ দিয়ে চলাচল করে। এগুলো থেকেই পৃথিবীর অভ্যন্তরস্থ গঠন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এসব তথ্যের মাধ্যমেই ঊনিশশো শতাব্দীর শেষদিকে জিওফিজিসিস্টরা বিশ্বাস করতেন, পৃথিবীর কেন্দ্রে আছে তরল পদার্থ, যাকে ঘিরে আছে কঠিন আবরণ। এই আবরণকে আবার ঘিরে আছে কঠিন পৃষ্ঠদেশ যাকে আমরা ভূত্বক বলি। কিন্তু এই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেন ডেনিশ সিস্মোলজিস্ট ইঙ্গ লেম্যান
Inge Lehmann
১৯২৯ সালে নিউ জিল্যান্ডের কাছে বিশাল এক ভূমিকম্প হয়। ইঙ্গ এই ভূমিকম্পের শক ওয়েভগুলো পর্যবেক্ষণ করে অবাক হয়ে যান। তিনি দেখেন কিছু P-wave, পৃথিবীর কেন্দ্র দ্বারা যেগুলোর বিচ্যুত হয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেগুলো ভূকম্পন স্টেশনে ধরা পড়েছে। এ থেকে তিনি ধারণা করেন, ওয়েভগুলো কেন্দ্রের কিছুটা ভেতরে ঢুকার পর কোনো এক সীমানার সাথে ধাক্কা খেয়ে আবার ফিরে এসেছে। এই ধারণার উপর ভিত্তি করে তিনি ১৯৩৬ সালে একটি গবেষণাপত্রে লিখেন – পৃথিবীর কেন্দ্র দুটো অংশ দ্বারা গঠিত।
১) একদম কেন্দ্রে একটি কঠিন অংশ এবং
২) কঠিন অংশটিকে বেষ্টন করে থাকা একটি তরল অংশ।
ইঙ্গের হাইপোথিসিস নিশ্চিতভাবে গৃহীত হয় ১৯৭০ সালে।
১৯৯৩ সালে ১০৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করা এই নারী বিজ্ঞানী জীবদ্দশায় খুব দুঃখ করেছিলেন মেয়েদের প্রতি বিজ্ঞান মহলের আচরণ দেখে। ১৯৮০ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ছেলে এবং মেয়ের বুদ্ধিমত্তায় কোনো পার্থক্য পাওয়া যায় নি। কিন্তু হতাশ হয়ে লক্ষ্য করলাম, সবাই এভাবে ভাবে না।” আরেকবার নিজের ভাগ্নে/ভাস্তে নীল গ্রোসকে বলেছিলেন, “তোমার জানা উচিৎ কতো অযোগ্য পুরুষের সাথে আমাকে প্রতিযোগিতা করতে হয় – অকারণে।”
****** ****** ******* ইঙ্গ লেম্যান সম্পর্কে কিছু তথ্য ****** ****** ******
• ইঙ্গ লেম্যান তাঁর পড়াশোনা শুরু করেন বিজ্ঞানী নিলস বোরের আন্টি হান্না এডলার পরিচালিত বিদ্যালয়ে, যেখানে ছেলেমেয়ে উভয়কেই সমান চোখে দেখা হতো। এটা ছিল ঐ সময়ের জন্য খুবই ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা!
• ইঙ্গের বাবা আলফ্রেড লেম্যান ছিলেন এক্সপেরিমেন্টাল সাইকোলজিস্ট। ইঙ্গের মতে, তাঁর বাবা এবং হান্না এডলার ছিলেন ইঙ্গের বুদ্ধিমত্তা বিকাশের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবক।
• ১৯১০ সালে তিনি ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত বিষয়ে পড়তে যান। কিন্তু ১৯১১ সালে দেশে ফিরে আসেন পড়াশোনার ব্যাপারে প্রচণ্ড ক্লান্তি নিয়ে। প্রায় সাত বছর পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার পর ১৯১৮ সালে তিনি কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় পড়তে আরম্ভ করেন। মাত্র দুই বছরের মধ্যে তিনি ফিজিক্যাল সায়েন্স এবং গণিতের উপর দুটো ডিগ্রী নিয়ে নেন।
• ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে কয়েক বছর চাকরী করার পর জিওডেসিস্ট নিলস নরল্যান্ডের সহকারী হিসেবে যোগ দেন ইঙ্গ। জিওডেসি হল পৃথিবীর আকার-আকৃতি পর্যবেক্ষণ ও পরিমাপের বিজ্ঞান। নিলস তাঁকে ডেনমার্ক এবং গ্রিনল্যান্ডে ভূকম্পন স্টেশন স্থাপনের কাজ দেন। এখান থেকেই সিস্মোলজির প্রতি ইঙ্গের আগ্রহ তৈরি হয়।

জন ন্যাশের সংক্ষিপ্ত জীবনী

- No comments
অস্কার পাওয়া মুভি A Beautiful Mind এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এই গণিতবিদ এবং অর্থনীতিবিদের কথা জেনেছে। আর বিজ্ঞানে আগ্রহী মহলে ওনাকে সবাই চেনে ১৯৯৪ সাল থেকেই, যখন উনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরষ্কার পেলেন। আর এ বছরেই তিনি Abel Prize পেলেন আরেকটি অসাধারণ আবিষ্কারের কারণ – বক্ররেখার আংশিক ব্যবকলন সমীকরণ (nonlinear partial differential equation) এর জন্য। তার দেয়া থিওরিগুলো শুধু গণিতে আর অর্থনীতিতে নয়, বিবর্তনবাদ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, একাউন্টিং, রাজনীতিসহ আরো অনেক ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়।
কার্নেগী মেলন ইউনিভার্সিটি থেকে প্রথমে কেমিক্যাল ইনজিনিয়ারিং, পরে পাল্টে কেমিস্ট্রি, এবং শেষ পর্যন্ত গণিতে এসে তরী ভিড়িয়েছিলেন এই ভদ্রলোক। অবশেষে অনার্স-মাস্টার্স করার পর গেলেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতে। তার পিএইচডি থিসিস ছিলো মাত্র ২৮ পৃষ্ঠার। জীবনের শেষ দিকে এখানেই শিক্ষকতা করতেন তিনি।
১৯৫৯ এর দিকে তার স্কিজোফ্রেনিয়া ধরা পড়ে। তখন অনেকগুলো বছর তাকে মানসিক হাসপাতালে থাকতে হয়। ১৯৭০ এর পর তার অবস্থা আস্তে আস্তে উন্নত হতে থাকে। ১৯৭৫ এর দিকে তিনি আবার একাডেমিক কাজকর্মে ফিরে আসেন। ১৯৭৮ সালেই পেয়ে যান জন ভন নিউম্যান থিওরি পুরষ্কার। আর ১৯৯৪ সালে নোবেল প্রাইজ। অসুস্থতার সাথে তার কষ্টকর যুদ্ধ এবং সেরে ওঠা নিয়ে লেখিকা সিলভিয়া নাসার একটা বই লিখেছিলেন, A Beautiful Mind. সেখান থেকেই মুভির চিত্রনাট্য রচনা করা হয়।
রাসেল ক্রো, যিনি জন ন্যাশ এর চরিত্রে চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছিলেন, তিনি টুইট করেছেন, //Stunned…my heart goes out to John & Alicia & family. An amazing partnership. Beautiful minds, beautiful hearts.//
১৯২৮ সালের ১৩ই জুন জন্ম নেয়া এই ব্যক্তিটি ২০১৫ সালের ২৩শে মে সস্ত্রীক মারা যান, দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। পুলিশ জানিয়েছেআমেরিকার নিউ জার্সিতে তাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে রাস্তার রেলিং-এর সাথে সংঘর্ষের ফলে তারা মারা যান।

ভিক্টর গ্রিনিয়ার্ডের সংক্ষিপ্ত জীবনী

- No comments
রসায়নে নোবেল পুরষ্কার বিজয়ী ভিক্টর গ্রিনিয়ার্ড
জন্ম – ১৮৭১ সালের ০৬ই মে
মৃত্যু – ১৯৩৫ সালের ১৩ই ডিসেম্বর
ভিক্টর গ্রিনিয়ার্ড

ভিক্টর গ্রিনিয়ার্ড ১৯১২ সালে নোবেল পুরষ্কার জিতেছিলেন (এক জার্মান বিজ্ঞানীর সাথে যৌথভাবে), গ্রিনিয়ার্ড বিক্রিয়ার ফর্মূলা দেয়ার জন্য।
১৯০১ সালে তিনি অ্যালকাইল ম্যাগনেসিয়াম হ্যালাইড আবিষ্কার করেছিলেন। জৈব সংশ্লেষণের জন্য এই বিক্রিয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটার সরল রাসায়নিক গঠন হচ্ছে R-Mg-X… এখানে R – একটা জৈব গ্রুপ, Mg যে ম্যাগনেসিয়াম তা তো বোঝেনই, আর X হচ্ছে ব্রোমিন, ক্লোরিন, আয়োডিন এর মত হ্যালোজেন। দ্বিতীয় বা তৃতীয় মাত্রার এলকোহল, হাইড্রোকার্বন, কার্বক্সিলিক এসিড – অনেককিছু সংশ্লেষণ করা যায় এই বিক্রিয়ার মাধ্যমে।

কার্ল সেগানের বর্ণিল ও ব্যস্ত জীবন

- No comments
Carl Sagan

আইজাক অ্যাসিমভ নাকি অসম্ভব দাম্ভিক লোক ছিলেন। কাউকেই তেমন পাত্তা দিতেন না। উনি বলেছেন, ‘‘পৃথিবীতে আমার চেয়েও বুদ্ধিমান মাত্র দুজন ব্যক্তি আছেন। তার মধ্যে একজন কার্ল সেগান।’’
 এই লোকটার নতুন করে পরিচয় করে দেওয়াটা খুব কঠিন। তার সম্পর্কে যাই বলা হোক না কেন, সেটা ওনার ব্যক্তিত্বের মাহাত্ম্যকে ফুটিয়ে তুলতে পারবেনা কখনোই। জ্যোতির্বিজ্ঞানী, কসমোলজিস্ট, জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী, লেখক, বিজ্ঞান জনপ্রিয়কারী, এবং আমার চোখে বিজ্ঞান বিপ্লবী, ক্ষণজন্মা পুরুষ কার্ল সেগান। এই বিশাল অন্ধকার মহাকাশে, পৃথিবী নামে এই ছোট্ট নীল বিন্দুটির ততোধিক নগণ্য অধিবাসী হিসেবে আমাদের ব্যক্তিগত বিশ্বাস, হিংসা, দুঃখ, স্বার্থগুলো যে কতো অর্থহীন, তা বার বার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন এই লোক। আবার সম্মিলিত ভাবে একই উদ্দেশ্যে কাজ করে গেলে একসময় আমরা গ্যালাক্সী থেকে গ্যালাক্সী পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বো- এই স্বপ্নও দেখিয়েছেন।
 তার জীবনে অর্জন ছিলো প্রচুর। কিন্তু পাশাপাশি, উপযুক্ত সময়ের অনেক আগে জন্ম নেয়ার ঝামেলাও কম সইতে হয়নি লোকটাকে। আসুন, তার বর্ণিল, ব্যস্ত, আর সর্বোপরি ছোট্টো জীবনটা নিয়ে আলোচনা করে কিছুটা সময় কাটাই।
১৯৩৪ সালের নভেম্বরের ৯ তারিখে নিউইয়র্ক শহরে তার জন্ম। Demon-Haunted World বইতে সেগান এক যায়গায় বলেছেন, ছোটোবেলায় বাবা স্যাম সেগানকে প্রশ্ন করে করে পাগল করে ছাড়তেন! তার যাবতীয় প্রশ্নই ডায়নোসর দিয়ে শুরু হয়ে এক পর্যায়ে পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাকাশ পর্যন্ত চলে যেতো। তার বাবা ধৈর্য ধরে প্রতিটা প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করে যেতেন, আরও প্রশ্ন করার উৎসাহ দিতেন। তার সেগান হয়ে ওঠার পেছনে ঐ বিজ্ঞান না-জানা ভদ্রলোকের অবদান কম নয়।
৫ বছর বয়সে নিউইয়র্কের পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে “স্টার” এর ওপরে লেখা চেয়েছিলেন। সামনে দাঁড়ানো পুঁচকে ছোঁড়া দেখে লাইব্রেরিয়ান তাকে হলিউড “সুপারস্টার”-দের ওপরে লেখা ধরিয়ে দিলো। কিন্তু তিনি চেয়েছিলেন, সত্যিকারের নক্ষত্র নিয়ে লেখা বই। লাইব্রেরিয়ান অবাক হলো, কিন্তু এবার ঠিকঠাকমত একটা বই দিলো। সেগান সেখানেই পড়লেন, সূর্য-ও একটা নক্ষত্র; রাতের আকাশে যে তারাগুলো দেখা যায়, সেগুলোর মতই। কিন্তু সেগুলো এতো দূরে যে, ওগুলো খুব ছোটো মনে হয়।
হঠাৎ করে পুরো মহাবিশ্বটা তার কাছে বিশাল হয়ে গেলো। তিনি এই বিশালতায় মুগ্ধ হয়ে গেলেন। সারা জীবন সেই মুগ্ধতা থেকে আর বের হতে পারেননি তিনি। পেশা আর আবেগ, দুটো দিয়েই জড়িয়ে ধরলেন নক্ষত্রবিদ্যা।
ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো থেকে ১৯৫৫ সালে পদার্থবিদ্যায় অনার্স, আর ৫৬ সালে মাস্টার্স করেছিলেন। এরপরেই তার নক্ষত্রবিদ্যা আর জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানে পিএইচডি করলেন। সবাই মাস্টার্স বা পিএইচডি লেভেল থিসিস লিখলেও উনি অনার্সে থাকাকালেই ফিজিক্যাল কেমিস্ট H. C. Urey এর সাথে প্রাণের উৎস নিয়ে একটা থিসিস লিখেছিলেন। পিএইচডি করে বের হবার পর দু বছর ফেলো হিসেবে ছিলেন ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে-তে।
কেউ ম্যাসাচুসেটস এর কেম্ব্রিজে বেড়াতে গেলে, স্মিথসোনিয়ান অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল অবজার্ভেটরি’র আশেপাশে বাতাস খেয়ে আসবেন। বার্কলে থেকে বের হবার পর, ৬২ থেকে ৬৮ সাল পর্যন্ত সেগান এখানেই কাজ করেছেন। একই সাথে হার্ভার্ডে গবেষণা করেছেন, লেকচার দিয়েছেন, এবং বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য একের পর এক প্ল্যান হাতে নিয়েছেন। এই অপরাধেই ৬৮ সালের পর হার্ভার্ডে তার চাকরির মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি। কারণ হিসেবে অন্যান্য প্রফেসররা যা বলেছিলেন তা হচ্ছে- ‘‘বিজ্ঞান টিজ্ঞান ভুয়া কথা। শালায় নিজে বিখ্যাত হইতে চায়! এরে হার্ভার্ডে দরকার নাই!’’
সেগান বিখ্যাত হতে চাননি। কসমস প্রচার হওয়ার পর, পাওয়ার ম্যাকিনটশ ৭১০০ মডেলের কম্পিউটারের কোড নেইম দেয়া হয়েছিলো ‘কার্ল সেগান’। এই তথ্য জানার পর সেগান অ্যাপলের নামে মামলা করে দিয়ে বলেছিলেন, নিজের নাম ভাড়া দিয়ে পয়সা বানানো বা বানাতে দেয়ার ইচ্ছা- কোনোটিই তার নেই।
হার্ভার্ডের পর সেগান জয়েন করেন তার জন্মস্থান নিউইয়র্ক স্টেটেরই আরেক শহর ইথাকা’র কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। এখানেই কয়েক বছর পর এক ছেলের কলেজ অ্যাপ্লিকেশন দেখে তাকে তিনি ডেকে পাঠান। প্রচণ্ড ব্যস্ততার ভেতরেও অনেকক্ষণ কথা হয় দুজনের। ছেলেটির ভাষায়- ‘‘আমি জানতাম, আমি বিজ্ঞানীই হতে চাই। তবে মানুষ হিসেবে আমার কি হওয়া উচিৎ, তা ওই বিকেলে কার্ল সেগান আমাকে শিখিয়েছিলেন।’’…………… সেই হাইস্কুল সিনিয়রের নাম Neil Degrasse Tyson – বাকীটা ইতিহাস। টাইসন একা নন, কত হাজার হাজার মানুষকে কে যে সেগান বিজ্ঞানের রাস্তায় নিয়ে এসেছেন, তার কোনো ইয়ত্তা নেই।
তার বিজ্ঞান সংক্রান্ত আবিষ্কারগুলোর কথা তো বলাই হলোনা। শনির উপগ্রহ টাইটানে বা জুপিটারের গ্রহ ইউরোপাতে পানির সম্ভাবনা থাকার কথা তিনিই প্রথমদিকে বলেছিলেন। সবাই ভেনাসকে স্বর্গের মত বলে দাবি করলেও তিনি বলেছিলেন, ভেনাস আসলে জ্বলন্ত দোজখ, যেখানে ভূ-পৃষ্ঠের তাপমাত্রা ৫০০ ডিগ্রী। তার কাজের জন্য ন্যাশনাল একাডেমি অফ সায়েন্সের সর্বোচ্চ সম্মান Public Welfare Medal পেয়েছিলেন তিনি।
আমেরিকার মহাকাশ যাত্রার একদম শুরু থেকে সাথে ছিলেন তিনি। ১৯৫০ সাল থেকেই তিনি নাসার নাসার উপদেষ্টা  অ্যাপোলো প্রোগ্রামের যে মহাকাশচারীরা চাঁদে যেতো, তাদের সাথে কথা বলাটা তার চাকরির দায়িত্ব ছিলো। UFO (Unidentified Flying Object), এলিয়েনদের দ্বারা কিডন্যাপ হবার রিপোর্ট—এসব বিষয়ে এতোই উৎসাহী ছিলেন যে তাকে ইউ এস এয়ার ফোর্সের UFO সংক্রান্ত অনুসন্ধান প্রজেক্ট- Project Blue Book-এর এর অ্যাড হক কমিটির মেম্বার করা হয়েছিলো। অনেকে দাবি করতো, ওরা এলিয়েন দেখেছে। ওদের কথা সত্যি হলেই তিনি বেশি খুশি হতেন, কিন্তু সত্যের প্রতি তার ভালোবাসা ছিলো আরো বেশি। সবসময়ই বলে গেছেন, অন্য গ্রহের প্রাণীর সাথে যোগাযোগ হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ, তবে চেষ্টা ছাড়েননি। ভিনগ্রহের প্রাণীদের সাথে যোগাযোগ নিয়ে তার লেখা সায়েন্স ফিকশন CONTACT বইয়ের উপর ভিত্তি করে মুভিও আছে একটা, একই নামে।
সায়েন্স ফিকশন CONTACT এর কথা তো বললামই। এছাড়াও তার লেখা বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে আছে Billions and Billions, Pale Blue Dot, Demon Haunted World, Broca’s Brain, The Dragons of Eden প্রভৃতি। তার মধ্যে Pale Blue Dot বইটার একটা অডিও ভার্সন বের করেছিলেন তার ভরাট, মোহনীয়, আবেগী কণ্ঠে। ওনার সেই কথাগুলো একটা ছেলেকে এতোই মুগ্ধ করেছিলো যে, সে ঐ অডিও থেকে ৪/৫ মিনিটের ক্লিপ নিয়ে নিজে দৃশ্য যোগ করে ভিডিও বানিয়েছে। সেই সিরিজেরই নাম “সেগান সিরিজ”।
আরেকটা বইয়ের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, COSMOS: A Personal Voyage. এই বইটার সাথেই শুধু না, কসমস শব্দটার সাথেই কার্ল সেগানের নাম জুড়ে গেছে। অনেকেই যখন কসমস শব্দটা শোনে, সাথে সাথে একজনের চেহারা ভেসে ওঠে – কার্ল সেগানের চেহারা।
১৯৮০ সালে সেগান নিয়ে এলেন, তার জীবনের সবচেয়ে বিশাল প্রজেক্ট। এই প্রজেক্ট তাকে পরিচিত করে তুলেছিলো গোটা বিশ্বের কাছে। আমার মতে, তিনি বিজ্ঞানী থেকে বিপ্লবীতে পরিণত হয়েছিলো এই প্রজেক্টের মাধ্যমে। আর সেই প্রজেক্টটা হচ্ছে বিজ্ঞানভিত্তিক বিখ্যাত টেলিভিশন সিরিজ, Cosmos: A Personal Voyage. কসমস মানে সবকিছু, তাই তের পর্বের এই সিরিজের মধ্যে তিনি দেখালেন সবকিছু। অনুবাদকদের আড্ডা থেকে এই সিরিজের বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে।
আমরা যখন অর্বাচীনের মতো নিজ স্বার্থে পৃথিবী ধ্বংসে পারদর্শিতা দেখাচ্ছি, সেগান তখন কসমস সিরিজে গ্রীন হাউজ ইফেক্টের কথা বলে আমাদের সাবধান করার চেষ্টা করছেন, যুদ্ধের উদ্দেশ্যে পারমাণবিক বোমার ব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়েছেন, কখনও শনির উপগ্রহ টাইটান দেখে হতাশ হচ্ছেন, আবার জুপিটারের উপগ্রহ ইউরোপার ভূপৃষ্ঠের বেশ কিছু অংশে পানির অস্তিত্ব আছে বলে প্রমাণ করছেন। ইউরোপা ভবিষ্যতে মানুষ বসবাসের উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলা যেতে পারে বলে স্বপ্ন দেখছেন। পৃথিবীকে আরও বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করেছেন, আবার মরিয়া হয়ে আমাদের জন্য পৃথিবীর বাইরে আরেকটা বসত খুঁজে বেড়িয়েছেন!
সেগান প্রমাণ করেছেন, বিজ্ঞান শুধু ল্যাবরেটরীর বন্ধ দরজার অন্যদিকে আবদ্ধ থাকার বিষয় না। পৃথিবীর প্রতিটা মানুষের যেমন বিজ্ঞান চর্চার অধিকার আছে, তেমনই আছে বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্বন্ধে প্রত্যেকটা তথ্য জানার অধিকার! এই সিরিজ নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বার বার। কর্নেলে ক্লাসের পর ক্লাস মিস গেছে; ব্যক্তিগত জীবন বলতে কিছু ছিলো না। অন্য প্রফেসরদের কঠোর সমালোচনা সহ্য করতে হয়েছে। কসমস দেখতে দেখতে অনেকবার মনে হয়েছে, কতো কষ্ট ভেতরে লুকিয়ে দিনের পর দিন ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়েছেন। হাসিমুখে আমাদেরকে সৃষ্টির আদি অন্তের গল্প শুনিয়ে গেছেন। কোনো নির্দিষ্ট মানুষ বা জাতি না- সমস্ত পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষকে এমনভাবে কখনও কি কেউ ভালোবাসতে পেরেছে?
প্রিয় সেগান,
আমি এখন ১৯৯৬ সালে। এখনও বেঁচে আছো তুমি। তিনবার মেরুদণ্ডের মজ্জা প্রতিস্থাপন (bone marrow transplant) করার অসম্ভব যন্ত্রণা ভোগ করার পর তোমাকে নিউমোনিয়ায় ধরেছে। কী করছো তুমি এখন? কষ্ট হচ্ছে খুব? শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা আছে নিশ্চয়ই! সেই কষ্ট? নাকি পৃথিবীকে আরও সময় দিতে পারলে না, সেই কষ্ট? বোকা মানুষগুলোকে আরেকটু বেশী ভালোবাসা দিতে পারলে না, সেই কষ্ট? নাকি এদের জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্রের কোথাও আরেকটা ঘর খুঁজে দিয়ে যেতে পারলে না—সেই দুঃখটাই বেশি ছিলো?
আমার এক বন্ধু একবার আমাকে বলেছিলো, ‘‘তুমি মানুষকে নিয়ে এতো ভাবো? এক টুকরো সেগান তোমার ভেতরেও আছে।’’
আমার বন্ধুর কথা সত্য।
আমি মানতে চাই না, তুমি নেই।
পৃথিবীতে একটা মানুষও যতদিন তোমার আদর্শ বুকে নিয়ে কাজ করে যাবে, ততদিন তুমি থাকবে।
এই মহাবিশ্বের যে কোনো প্রান্তেই হোক, তুমি থাকবে।
সেদিনও কেউ এমনভাবেই বলবে, “কার্ল এডওয়ার্ড সেগান, তোমার মতো করে কেউ কখনও আমাদের ভালোবাসেনি। তুমি বেঁচে থাকো অনন্তকাল”।

মাইকেল ফ্যারাডে (বিজ্ঞানী) – মানবজাতি যার কাছে কৃতজ্ঞ!

- No comments
এলবার্ট আইনস্টাইন তার পড়ার ঘরের দেয়ালে কেবল তিনজনের ছবি ঝুলিয়ে রেখেছিলেন – আইজ্যাক নিউটন, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, আর তৃতীয় জন – যাকে নিয়ে আজ আমাদের গল্প – মাইকেল ফ্যারাডে। মহান বিজ্ঞানী রাদারফোর্ডকে চেনেন তো? তিনি মাইকেল ফ্যারাডেকে নিয়ে বলেছিলেন, “তার আবিষ্কারগুলোর মাত্রা আর ব্যাপকতা, বিজ্ঞান আর শিল্পকারখানার জগতে সেগুলোর গুরুত্ব বিবেচনা করলেই বোঝা যায় – এই লোকটাকে যত বড় সম্মানই দেয়া হোক না কেন, সেটা যথেষ্ট নয়।”
মাইকেল ফ্যারাডে (বিজ্ঞানী)
ব্রিটিশ পদার্থবিজ্ঞানী, রসায়নবিজ্ঞানী, আবিষ্কারক মাইকেল ফ্যারাডের জীবনীতে সবাইকে স্বাগতম। শুরুতেই এক নজরে দেখে নিই সাধারণ কিছু তথ্য –
জন্ম – ২২শে সেপ্টেম্বর, ১৭৯১, জন্মস্থান – লন্ডন, ইংল্যান্ড
শৈশব – কী অদ্ভুত কষ্টে আর সমস্যায় যে কেটেছে এই লোকটার শৈশব!
স্ত্রী – সারাহ বার্নার্ড
সন্তান – নেই
ঝোঁক – পদার্থ (বিশেষ করে তাড়িৎ-চৌম্বক), রসায়ন
আবিষ্কার – ওরে বাবা! এখানে লিখে শেষ করা যাবে না। পাবেন নিচের দিকে, গল্পে গল্পে আসবে। শুধু একটা জিনিস বলে রাখি, তার কাজের মাহাত্ম্য বোঝানোর জন্য – আধানের একক ফ্যারাডে (অবশ্য এখন কুলম্ব ব্যবহার করা হয়), আধান সংরক্ষণ ক্ষমতার একক ফ্যারাড (Farad, ফ্যারাডে নয়), এক মোল ইলেকট্রনে আধানের পরিমাণকে বলে ফ্যারাডে ধ্রুবক বা Faraday Constant.
পুরষ্কার – Royal Medal (দুইবার), Copley Medal (দুইবার), Rumford Medal, Albert Medal
মৃত্যু – ২৫শে আগস্ট, ১৮৬৭, মৃত্যুস্থল – ইংল্যান্ড
এই লোকটার আবিষ্কারগুলোর গুরুত্ব এতো বেশি যে, বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠান “কসমস”-এর (২০১৪ সালের) সিকুয়েলে গোটা একটা পর্ব উৎসর্গ করা হয়েছিলো তার জন্য। এই পোস্টে সেই পর্বটি থেকে অনেক গল্পই থাকবে।

শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতা

ফ্যারাডের উচ্চারণে সমস্যা ছিলো। তিনি “র” উচ্চারণ করতে পারতেন না। এটা নিয়ে সবখানে হাসাহাসি হতো, স্কুলেও। তিনি বেশিদূর পড়াশোনা করেননি, সামান্য যোগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগ শেখা পর্যন্তই ছিলো তার গণিতবিদ্যার দৌড়! তার পরিবারও ছিলো দরিদ্র। চার সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। স্কুলেও আর গেলেন না, পড়াশোনাও করলেন না। তাকে লেগে পড়তে হলো জীবিকার কাজে, মাত্র ১৩ কি ১৪ বছর বয়সে! স্থানীয় একটা বই বাঁধাই করার প্রতিষ্ঠানে কিশোর ফ্যারাডে যোগ দিলেন। বস্তুত, এখানেই তিনি নিজেকে স্বশিক্ষিত করেছিলেন। দিনের বেলায় বই বাঁধাই করতেন, রাতের বেলায় বই পড়তেন বসে বসে।

বই বাঁধাইয়ের কারখানা থেকে রয়েল ইন্সটিটিউট

লন্ডনের বিখ্যাত রয়্যাল ইন্সটিটিউশনে তিনি একবার আবিষ্কারক হামফ্রে ডেভি’র বিজ্ঞান প্রদর্শনীর অনুষ্ঠান দেখতে গেলেন। সবাই যখন অনুষ্ঠান উপভোগে মত্ত, ফ্যারাডে তখন নোট নিতে ব্যস্ত। পুরো অনুষ্ঠানের কথাগুলোই লিখে ফেললেন তিনি! নিজে থেকে এতো এতো নোট যুক্ত করলেন যে শেষ পর্যন্ত বইটার পৃষ্ঠা সংখ্যা দাঁড়ালো ৩০০! বই বাঁধাইয়ের অভিজ্ঞতা তো ছিলোই! সেটাকে কাজে লাগিয়ে, নোটগুলোকে একটা বইয়ের মত বানিয়ে সেটা পাঠিয়ে দিলেন স্যার ডেভি’কে। হামফ্রে ডেভি মুগ্ধ হলেন ফ্যারাডের স্মৃতিশক্তি দেখে। এমন সময় তার গবেষণাগারের একটা দুর্ঘটনায় তিনি সাময়িকভাবে দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে গবেষণায় অক্ষম হয়ে গেলেন। লেখালেখি করা তার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিলো না। তখন, তিনি ফ্যারাডেকে ডেকে পাঠালেন, নিজের এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করার জন্য। দিনের বেলায়, রয়েল ইন্সটিটিউটে স্যার ডেভির গবেষণাগারে সাহায্য করতেন ফ্যারাডে। সাহায্য বলতে বিশেষ করে গবেষণার নোট নেয়া, এটা সেটা এগিয়ে দেয়া, পরিষ্কার করা, আগে থেকে দেখিয়ে দেয়া নিরীক্ষাগুলোর প্রস্তুতি করা ইত্যাদি।
ডেভির স্ত্রী ফ্যারাডেকে অবজ্ঞা-অবহেলা করতেন। তখনকার সমাজটাই এমন ছিলো যে অর্থনৈতিকভাবে নিচু স্তরের মানুষকে হেয় করা হতো। ডেভি যখন ফ্যারাডেকে নিয়ে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ভ্রমণে দূর-দূরান্তে (এমনকি অন্য দেশে) যেতেন, তখন ডেভির স্ত্রী তাকে ঘোড়ার গাড়ির ভেতরে বসতে দিতেন না। তিনি ফ্যারাডেকে অন্যান্য চাকরদের সাথে খাওয়াদাওয়া করাতেন। এতো অপমান করতেন যে মাঝে মাঝে ফ্যারাডের ইচ্ছে হতো, একা একা আবার ইংল্যান্ডে চলে যেতে।

কর্মচারী থেকে আবিষ্কারক

অবশ্য স্যার হামফ্রে ডেভি নিজে খারাপ ব্যবহার করতেন না ফ্যারাডের সাথে। এমনকি নিজের লেখালেখির মধ্যে তিনি ফ্যারাডের অবদানের কৃতজ্ঞতাও স্বীকার করতেন।
কোনো ধাতব বস্তুতে বিদ্যুৎ চালনা করলে সেটা একটা অস্থায়ী চুম্বকে পরিণত হয়। এটা তখনকার বিজ্ঞানীদের জানা ছিলো না। হামফ্রে ডেভি এবং তার সহ-গবেষক বিদ্যুতায়িত বস্তুর এই চৌম্বকক্ষেত্র ব্যাপারটা বুঝতে না পেরে খাবি খাচ্ছিলেন। এই ধর্মটাকে কাজে লাগিয়ে কোনো ধাতব দণ্ডকে ক্রমাগত ঘোরানো যায় কিনা, সেই চিন্তা করছিলেন। তখন মাইকেল ফ্যারাডে, গবেষণাগারের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কর্মী, সারা দিন রাত এটা নিয়ে ভাবতে লাগলেন। তিনি এটা সেটা নিয়ে টুকটাক প্রচেষ্টা চালাতে লাগলেন। এবং একদিন, সত্যি সত্যি তিনি বিদ্যুৎকে কাজে লাগিয়ে একটা ধাতব বস্তুকে ঘোরাতে সক্ষম হলেন। এই প্রথমবারের মত কেউ বিদ্যুৎকে যান্ত্রিক শক্তিতে পরিণত করলো। আবিষ্কৃত হলো ইলেকট্রিক মোটরের মূলনীতি।
আজ আমরা আশেপাশে যত যন্ত্রকে বিদ্যুৎ দিয়ে চলতে দেখছি, সেটার সূত্রপাত হয়েছিলো মাইকেল ফ্যারাডের এই গবেষণার হাত ধরে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর কথা বলতে গেলে এটা একদম ওপরের দিকে থাকবে। তখনই মানুষ এটার আশু গুরুত্বের কথা বুঝতে পেরেছিলো। মাইকেল ফ্যারাডে প্রায় রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে গেলেন। ১৮২৪ সালে, মাত্র ৩২ বছর বয়সে, তাকে রয়েল সোসাইটির সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হলো। এটা একটা স্বীকৃতি ছিলো যে, ফ্যারাডে নিজ যোগ্যতায় একজন বিজ্ঞানী হয়ে উঠেছেন। পরের বছর তাকে রয়েল ইন্সটিটিউটের গবেষণাগারের পরিচালক বানিয়ে দেয়া হলো।

একটি কাঁচের বিস্কিট

নিজের অধীনের এই খ্যাতি হামফ্রে ডেভি হয়তো খুব একটা ভালো চোখে দেখেননি। তিনি ফ্যারাডেকে ধরিয়ে দিলেন একটা কাজ, যেটা ফ্যারাডে কখনোই পেরে ওঠেননি। কাঁচ জিনিসটা তখন অনেক মূল্যবান ছিলো। অপটিকস (optics) এর জগতে তোলপাড় হচ্ছিলো, শুধুমাত্র উন্নতমানের কাঁচের কারণে। আর এই কাঁচ যারা আবিষ্কার করেছিলো, তারা সেই আবিষ্কারের সূত্র লুকিয়ে রেখেছিলো সবার কাছ থেকে। তাদের বানানো কাঁচ গবেষণা করে সেই সূত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করলেন ফ্যারাডে। এবং চার বছর ধরে চেষ্টা করার পর রণে ভঙ্গ দিলেন, যখন হামফ্রে ডেভি মারা গেলেন। নিজের ব্যর্থতার স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে, ঘরের তাকে একটি কাঁচের বিস্কিট রেখে দিলেন তিনি। চার বছরের ব্যর্থতার এই স্মৃতিচিহ্ন একদিন চরম একটা আবিষ্কারের কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু সেই কাহিনী আরো পরে!

বার্ষিক সায়েন্স লেকচারের আয়োজন

স্যার হামফ্রে ডেভি মারা যাওয়ার পর গবেষণাগারের পরিচালকের পদে আসীন হলেন মাইকেল ফ্যারাডে। জীবন তাকে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে এলো! নতুন এই ক্ষমতা পেয়ে তিনি অত্যন্ত চমৎকার একটা কাজ করলেন। তরুণদের জন্য বার্ষিক সায়েন্স লেকচারের আয়োজন করলেন রয়েল ইন্সটিটিউটে।
Faraday Michael Christmas lecture
প্রথম সেই আয়োজন হয়েছিলো ১৮২৫ সালে, এবং আজও সেটা চলছে। এই আয়োজনে বাচ্চাদের সামনে গল্পের ছলে বক্তৃতা দিয়েছেন ইতিহাসের বিখ্যাত সব ব্যক্তিরা। সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে ১৯৭৩ সালে এসেছিলেন ডেভিড এটেনবরো, ১৯৭৭ সালে এসেছিলেন কার্ল সেগান, আর ১৯৯১ সালে এসেছিলেন রিচার্ড ডকিন্স।

জেনারেটর আবিষ্কার

জেনারেটরের মূলনীতি (গতিশক্তি থেকে বিদ্যুৎ শক্তিতে রুপান্তর) আবিষ্কার করলেন মাইকেল ফ্যারাডে।
একটা তারের কুণ্ডলীর মধ্য দিয়ে চুম্বককে আনা-নেওয়া করার মাধ্যমেই অসম্পূর্ণ বর্তনীকে সম্পূর্ণ করলেন। সোজা বাংলায় (!), “he invented the switch”. অর্থাৎ, বিদ্যুতের শক্তিকে সাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার কাজে আরো এক ধাপ এগিয়ে নিলেন তিনি।

স্মরণশক্তি আর বিষণ্ণতা সংক্রান্ত সমস্যা

৪৯ বছর বয়সে ফ্যারাডে স্মৃতিশক্তিজনিত অসুস্থতার মুখোমুখি হলেন। তার স্মরণশক্তি দুর্বল হয়ে পড়লো। অনেক সময় অনেক কিছু তিনি মনে করতে পারতেন না। এজন্য তার মধ্যে প্রচণ্ড বিষণ্নতা তৈরি হলো। হবারই কথা! তিনি একজন বিজ্ঞানী, মস্তিষ্ক তার হাতিয়ার। আর সেই হাতিয়ারই কিনা তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করছিলো। ফ্যারাডে কি এখানেই দমে যাবেন?
তিনি সম্পূর্ণ সেরে ওঠেননি কখনোই। কিন্তু তার সবচেয়ে মহান আবিষ্কারগুলো, যেগুলো আমরা এখনো পড়ি, সেগুলো কিন্তু আরো পরের কথা!

তিন শক্তির বন্ধন

ইতোপূর্বে আমরা জানলাম যে, ফ্যারাডে বিদ্যুৎ আর চৌম্বক বলের মধ্যে সম্পর্ক আবিষ্কার করেছিলেন। এই দুটো বল (force) মিলে হচ্ছে ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বা তাড়িত-চৌম্বক বল। কিন্তু এই দুই বল কি অন্য কোনোকিছুর সাথে সম্পর্কিত? তিনি তিন ধরনের শক্তির (energy) মধ্যে সম্পর্ক আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখতে চাইলেন। তৃতীয় শক্তিটার নাম ছিলো আলো। তিনি দেখতে চাইলেন ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বল প্রয়োগ করে পোলারাইজড আলোকরশ্মিকে বাঁকিয়ে দেয়া যায় কিনা। তিনি একের পর এক পরীক্ষা করলেন। তিনি দেখলেন, সাধারণ বায়ু বা শূন্য মাধ্যমে চলা আলোকে বাঁকানো যাচ্ছে না। তাই তিনি আর অনেক অনেক মাধ্যম ব্যবহার করলেন। আলোকে সেগুলোর মধ্যে দিয়ে প্রবাহিত করে চৌম্বকক্ষেত্র দিয়ে বাঁকাতে চাইলেন, কিন্তু পারলেন না। বিভিন্ন গ্যাস নিয়ে চেষ্টা করলেন, তরল (এমনকি অ্যাসিড) নিয়ে চেষ্টা করলেন; পারলেন না। অনেকটা বেপরোয়া হয়ে, মাধ্যমের জায়গায় বসিয়ে দিলেন নিজের ব্যর্থতার স্মৃতিচিহ্নটিকে, সেই কাঁচের বিস্কিটটিকে। মনে আছে তো সেটার কথা? যাই হোক, সেটার মধ্যে দিয়ে গমন করে আলো তার গতিপথ পালটে নিলো! এই পরীক্ষার ফলাফল কেন মানবজাতির জন্য মহা গুরুত্বপূর্ণ?
এই কারণে যে, এর মাধ্যমেই আমরা প্রকৃতির উপাদানগুলো যে আসলে একে অপরের সাথে কতটা গভীরভাবে সংযুক্ত, সেটা বুঝতে পারলাম। ব্রহ্মাণ্ডের আদি শক্তিগুলোর মধ্যে যে কী লীলাখেলা চলে, তা তিনি দেখিয়ে দিলেন। এই আবিষ্কারটাই আইনস্টাইন, হাবল, লেমিত্রের আবিষ্কারগুলোর পথ সুগম করে দিয়েছিলো।

চৌম্বকক্ষেত্র এবং চৌম্বক বলরেখার আবিষ্কার

কেন চুম্বক জিনিসটা সবসময় উত্তর-দক্ষিণ হয়ে থাকে – এটা নিয়ে মানুষ ভেবেছে সবসময়ই। লোহার গুঁড়াকে চুম্বকের ওপর ছড়িয়ে দিলে যে এমন একটা আকৃতি ধারণ করে, এটাও জানা ছিলো।
কিন্তু কেন এমন হয়, কেউ জানতো না। ফ্যারাডে জানতেন, ইলেকট্রিসিটি প্রবাহিত করলে তারও চুম্বকে পরিণত হয়। তিনি সেটাকে দিয়ে একই পরীক্ষা করলেন। ফলাফল আসলো এরকম।
এবার তিনি বুঝতে পারলেন, চুম্বক জিনিসটা সবসময়েই নিজের চারপাশে একটা ক্ষেত্র তৈরি করে। প্রথমে তিনি এটাকে চৌম্বক বলরেখা (magnetic lines of force), পরবর্তীতে শুধু বলরেখা (lines of force), এবং আরো পরে চৌম্বকক্ষেত্র (magnetic field) বলা শুরু করলেন।
তিনি এমন এক প্রশ্নের সমাধান দিলেন যা আইজ্যাক নিউটনকেও হতবাক করে দিয়েছিলো। নিউটন মহাকর্ষের সূত্র দিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি জানতেন না, এতো দূর থেকেও স্পর্শ না করেই মহাকর্ষ কিভাবে কাজ করে? ফ্যারাডে বললেন, ওদের মহাকর্ষের ক্ষেত্র কিন্তু ঠিকই একে অপরকে স্পর্শ করে। এজন্যেই চুম্বক, পৃথিবী নামক দানবীয় চুম্বকের বলরেখা দ্বারা প্রভাবিত হয়, এজন্যেই সে উত্তর-দক্ষিণে মুখ করে থাকে।

জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল, পুরনো অতীতের ভূত

নিজের আবিষ্কারটাকে তিনি সবার কাছে প্রচার করলেন। কিন্তু সেটার পেছনে কোনো গাণিতিক ব্যাখ্যা দিতে পারলেন না। কারণ, সেই যে ছোটোবেলায় তিনি দারিদ্র্যে ভুগেছিলেন, ঐ যে তিনি স্কুল ছেড়ে দিয়েছিলেন। গণিতের জটিলতা তিনি কখনোই বুঝে উঠতে পারেননি। তাই প্রায় সবাই ফ্যারাডের কথাগুলোকে প্রমাণ হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালো। কেউ কেউ খোঁচা মারতেও ছাড়লো না। এমন সময় তার সাহায্যে এগিয়ে এলেন মোটামুটি সুপরিচিত একজন তরুণ গণিতবিদ, জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল।

জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েল

তিনি মনে করলেন, ফ্যারাডের এই আবিষ্কার নিঃসন্দেহে চোখ ধাঁধানো। তিনি বসে গেলেন, এই চৌম্বকক্ষেত্রের বিস্তারটাকে একটা গাণিতিক রুপ দেয়ার জন্য। লিখে ফেললেন, On Physical Lines of Force.
সেটার পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিলেন মাইকেল ফ্যারাডের কাছে। ঠিক যেভাবে, সূদূর অতীতে স্যার হামফ্রে ডেভির কাছে তারই কাজ নিয়ে একটা বই পাঠিয়েছিলেন ফ্যারাডে। ম্যাক্সওয়েল যে ফ্যারাডের অতীত, ফ্যারাডের ভূত!
আমি মাঝে মাঝে চিন্তা করি, কী ভয়াবহ আবেগময় একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিলো তখন ফ্যারাডের মনে। কী চিন্তা করছিলেন তখন তিনি? তিনি কি কেঁদে ফেলেছিলেন? তিনি কি তার ভুলোমনের বিষণ্ণতা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে গিয়ে প্রশান্তি পেয়েছিলেন?
এই আবিষ্কারটার আরো ব্যাপকতার কথা শুনবেন? খুব শীঘ্রই ম্যাক্সওয়েল দেখলেন যে এই ক্ষেত্রটা স্থির নয়, বরং সবসময়েই ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিটি মুহূর্তে। সেই ছড়িয়ে পড়া প্রবাহটাকে কাজে লাগিয়েই আজ আমরা যেকোনো কিছু সরাসরি সম্প্রচার করি, তথ্য বিনিময় করি ইন্টারনেট দিয়ে। আপনি যে আমার লেখা পড়ছেন, সেটাও ঐ প্রবাহটাকে কাজে লাগিয়েই আপনার কাছে পৌঁছাচ্ছে। একটু চিন্তা করুন তো, মাইকেল ফ্যারাডে নামের এই লোকটা না জন্মালে কী হতো? বিদ্যুৎ, মোটর, অন্যান্য মেশিন হয়তো আবিষ্কার হতো একসময় না একসময়, কিন্তু আপনি বা আমি হয়তো পেতাম না।

মৃত্যু

জীবিত থাকা অবস্থায় মাইকেল ফ্যারাডেকে প্রস্তাব দেয়া হয়েছিলো যে ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবি (Westminster Abbey)-তে তার কবর দেয়া হবে। সেখানে ব্রিটেনের রাজা-রাণীদের কবর দেয়া হয়। সেখানে আইজ্যাক নিউটনের মত বিজ্ঞানীর মৃতদেহ রাখা আছে। তিনি সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। ৭৫ বছর বয়সে, ১৮৬৭ সালের আগস্টের ২৫ তারিখে, মারা যাওয়ার পর তাকে লন্ডনের হাইগেইট সেমেটারিতে কবর দেয়া হয়। সেখানে স্ত্রী সারাহ এবং তার কবর পাশাপাশি।
মাইকেল ফ্যারাডে, আপনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।